নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আলাউদ্দিন বাবলুর। পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা, প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটানো এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৮ সালে পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে। এরপর থেকে শুরু হয় তাঁর প্রবাসজীবনের নতুন অধ্যায় যেখানে প্রতিটি দিন ছিল সংগ্রামের, প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল নতুন কিছু শেখার, আর প্রতিটি স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিল পরিবার।
প্রবাসজীবনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না বাবলুর জন্য। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, অচেনা ভাষা আর ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই ছিল একেকটি চ্যালেঞ্জ।
দেশ ছাড়ার প্রায় তিন মাস পর বড় ভাই আব্দুল কাদেরের কফিল, কাতারের আর্মি ব্রিগেডিয়ার ফরিদ মোস্তফার সহযোগিতায় একটি বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। কিন্তু আরবি, ইংরেজি কিংবা হিন্দি—কোনো ভাষাতেই দক্ষতা না থাকায় কর্মজীবনের শুরুতে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে।
ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে অফিসের উদ্দেশে বের হওয়া, বিকেল ৪টায় ফিরে নিজের রান্না করা, ঘর গোছানো ও দৈনন্দিন কাজ সামলানো এভাবেই চলত তাঁর প্রতিদিনের জীবন। পরিবারের জন্য কিছু করার প্রত্যয় তাঁকে সব কষ্ট সহ্য করার সাহস জুগিয়েছে।
বাবলুর ভাষায়, প্রবাসজীবনের সেই কঠিন দিনগুলো তাঁকে ধৈর্য ধরতে, আত্মনির্ভর হতে এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও হাল না ছেড়ে সামনে এগিয়ে যেতে শিখিয়েছে।
প্রবাসজীবন মানেই শুধু কষ্ট আর ত্যাগ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও অসংখ্য সুন্দর স্মৃতি। সপ্তাহে দুই দিন ছুটি থাকায় আল ওয়াকরায় ভাই-ব্রাদার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেতেন বাবলু।
ছুটির দিনে আড্ডা, আনন্দ, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি এবং বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরে বেড়ানো হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রবাসজীবনের অন্যতম আনন্দের অংশ। দোহার কর্নিশ, লুসাইল, আল খোর ও সীলাইন বিচসহ কাতারের বিভিন্ন স্থানে ঘোরার স্মৃতিগুলো আজও তাঁর মনে অমলিন।
প্রবাসের কঠিন সময়ে পাশে থাকা মানুষদের প্রতিও রয়েছে তাঁর গভীর কৃতজ্ঞতা। বড় ভাই আব্দুল কাদের, জাবেদ তালতো, সাদ্দাম ভাই, রাশেদ ভাই, ফয়সাল, সজিব, হাসান, শাহিন, আনোয়ার বদ্দা, জুয়েল ও নিজামের ভালোবাসা ও আন্তরিকতা তাঁকে প্রবাসের একাকিত্ব কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতা করেছে।
কর্মব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে থাকলেও বাবলুর হৃদয়ে সবচেয়ে গভীর বেদনার নাম পরিবার। মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন ও প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকার কষ্ট তাঁকে প্রতিনিয়ত অনুভব করতে হয়।
উৎসবের দিনগুলোতে কিংবা নিঃশব্দ রাতের নির্জনতায় আপনজনদের কথা মনে পড়লে মন ভারী হয়ে ওঠে। পরিবারের সুখের জন্য অর্থ উপার্জন করতে এসে জীবনের কত মূল্যবান মুহূর্ত যে তাঁদের কাছ থেকে দূরে কাটাতে হচ্ছে, সেই উপলব্ধি তাঁকে আবেগাপ্লুত করে।তবুও থেমে থাকার সুযোগ নেই। পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নই তাঁকে প্রতিদিন নতুন করে পথ চলার অনুপ্রেরণা দেয়।
বাবলুর স্বপ্ন, একদিন ইনশাআল্লাহ পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুন্দর ও স্বস্তির জীবন গড়ে তুলবেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবেন এবং সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখবেন।
তাঁর কাছে প্রবাসজীবন কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়,এটি জীবনের এক কঠিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই জীবন তাঁকে শিখিয়েছে ধৈর্য, আত্মত্যাগ, দায়িত্ববোধ, জীবনের প্রকৃত মূল্য এবং আপনজনদের ভালোবাসার গভীরতা।
আলাউদ্দিন বাবলুর গল্প তাই কেবল একজন প্রবাসীর ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে হাজারো প্রবাসীর স্বপ্ন, সংগ্রাম, নিঃসঙ্গতা, অশ্রু এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর নিরন্তর চেষ্টা।
প্রবাসের মাটিতে শরীর থাকলেও মন পড়ে থাকে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে। আর হৃদয়ের গভীরে লালিত হয় একটাই প্রত্যাশা একদিন সব ব্যস্ততা ও দূরত্ব পেরিয়ে আপনজনদের কাছে ফিরে শান্তিতে বাঁচার।
প্রবাসজীবনের এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রবাসীরা শুধু অর্থ উপার্জন করেন না, তাঁরা নিজেদের জীবনের অনেকটা সময়, আবেগ ও ভালোবাসা উৎসর্গ করেন প্রিয় পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য।
এমএমএস