নোয়াখালী জেলার আমিরাবাদ গ্রামের বিসমিল্লাহ হাউজের বাসিন্দা আব্দুল ছাওার, যিনি বাবর নামেই পরিচিত। পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা, প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটানো এবং নিজের জীবনে কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান কুয়েতে। কিন্তু প্রবাসে এসে বুঝতে পারেন, বিদেশের জীবন শুধু স্বপ্ন পূরণের নয়, এটি কঠিন সংগ্রাম আর ত্যাগেরও গল্প।

প্রবাসজীবনের শুরুতেই যুদ্ধের ভয়াবহতা

কুয়েতে আসার মাত্র ছয় মাসের মাথায় জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন বাবর। ১৯৯০ সালে শুরু হয় উপসাগরীয় যুদ্ধ। তখন তিনি নতুন প্রবাসী, ভাষাও ভালোভাবে জানতেন না। নতুন দেশ, অচেনা পরিবেশ আর যুদ্ধের আতঙ্কের মধ্যে শুরু হয় তাঁর টিকে থাকার লড়াই।

সেই সময় খাবারের তীব্র সংকট ছিল। কখনো এক দিন খাবার জুটলেও পরের কয়েক দিন খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ত। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ দিনগুলো আজও তাঁর স্মৃতিতে গভীর দাগ কেটে আছে।

যে বয়সে মানুষ ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখে, সে বয়সেই তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা আর খাবারের অভাব। সেই কঠিন সময় তাঁকে শিখিয়েছে—জীবনে টিকে থাকতে হলে ধৈর্য ধরতে হয়, সাহস রাখতে হয় এবং প্রতিকূলতার কাছে হার মানলে চলে না।

চিঠির পাতায় খুঁজতেন আপনজনদের

প্রবাসজীবনে শুধু কষ্ট নয়, কিছু স্মৃতিও থাকে, যা মানুষকে বেঁচে থাকার সাহস জোগায়। বাবরের কাছে তেমনই একটি স্মৃতি হলো কাজ শেষে বাসায় ফিরে কলম হাতে বসা।

আজকের মতো তখন মুহূর্তেই দেশে ফোন করে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ছিল না। তাই বাবা-মায়ের কাছে চিঠি লিখতেন তিনি। সেই চিঠির পাতায় তুলে ধরতেন নিজের কথা, পরিবারের প্রতি ভালোবাসা আর দূর দেশে বেঁচে থাকার অনুভূতি।

চিঠি লেখা ছিল আপনজনদের কাছে নিজেকে পৌঁছে দেওয়ার এক বিশেষ মাধ্যম। দূরত্ব ঘোচানোর সেই ছোট্ট প্রচেষ্টার মধ্যেই খুঁজে পেতেন মানসিক প্রশান্তি। প্রিয়জনদের উত্তর পাওয়ার অপেক্ষাও ছিল সেই সময়ের জীবনের একটি অংশ।

আপনজনদের থেকে দূরে থাকার কষ্ট

প্রবাসীর জীবনে সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি হলো পরিবার থেকে দূরে থাকা। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান কিংবা প্রিয় মানুষগুলোর সান্নিধ্য না পাওয়ার বেদনা সহজে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

উৎসবের দিনগুলোতে, একাকী রাতে কিংবা মন খারাপের মুহূর্তে আপনজনদের কথা আরও বেশি মনে পড়ে। জীবিকার প্রয়োজনে দূর দেশে থাকতে থাকতে কত আনন্দের মুহূর্ত, পারিবারিক স্মৃতি আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় যে হারিয়ে যায়, তার হিসাব রাখা কঠিন।

বাবরের দীর্ঘ প্রবাসজীবনেও মিশে আছে এমন অনেক অনুভূতি—একদিকে পরিবারের জন্য কিছু করার তাগিদ, অন্যদিকে আপনজনদের কাছে থাকার আকুলতা।

প্রবাসের শিক্ষা, জীবনের উপলব্ধি

১৯৮৯ সালে যে মানুষটি স্বপ্ন নিয়ে কুয়েতে পা রেখেছিলেন, তাঁর প্রবাসজীবনের শুরুতেই অপেক্ষা করছিল কঠিন বাস্তবতা। যুদ্ধের বিভীষিকা, খাবারের সংকট, ভাষার সমস্যা আর আপনজনদের থেকে দূরে থাকার কষ্ট—সব মিলিয়ে তাঁর পথচলা ছিল নানা পরীক্ষায় ভরা।

তবু প্রবাসজীবন তাঁকে শিখিয়েছে ধৈর্য, সাহস এবং পরিবারের ভালোবাসার মূল্য। অর্থ উপার্জন জীবনের একটি প্রয়োজন হলেও, আপনজনদের সঙ্গে কাটানো সময়ের মূল্য যে অপরিসীম, তা প্রবাসে থাকা মানুষই গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।

বাবরের গল্প, হাজারো প্রবাসীর গল্প

আব্দুল ছাওার বাবরের গল্প শুধু একজন মানুষের বিদেশে থাকার ইতিহাস নয়। এটি এমন এক প্রজন্মের গল্প, যাঁরা পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের দেশ ছেড়েছেন, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়েছেন এবং আপনজনদের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রবাসের মাটিতে জীবন কাটিয়েছেন।

প্রবাসীরা শুধু অর্থ উপার্জন করেন না, তাঁরা দূর দেশে রেখে আসেন জীবনের অনেক আনন্দ, প্রিয়জনদের সান্নিধ্য আর অসংখ্য স্মৃতি। তবু তাঁদের স্বপ্ন থেমে থাকে না। কারণ পরিবারের ভালো থাকা, বাবা-মায়ের মুখে হাসি আর আপনজনদের সঙ্গে আবারও এক ছাদের নিচে থাকার আশাই তাঁদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।

প্রবাসী ক্লাবের পক্ষ থেকে আব্দুল ছাওার (বাবর)-এর প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাঁর দীর্ঘ প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠুক ধৈর্য, সাহস ও পরিবারের প্রতি ভালোবাসার এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।

এসবি