নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরক্লার্ক ইউনিয়নের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আবুল কালাম ফয়সালের। পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন আর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে ২০১৪ সালের ২৮ অক্টোবর পাড়ি জমান কাতারে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ ১২ বছর। এই সময়ে জীবনের নানা রং দেখেছেন তিনি—হাসি, কান্না, প্রাপ্তি, বঞ্চনা, সংগ্রাম আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
তাঁর উপলব্ধি, প্রবাসজীবন শুধু অর্থ উপার্জনের গল্প নয়; এটি টিকে থাকার, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার এবং প্রতিনিয়ত স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার এক কঠিন অধ্যায়।
আট মাসের বেকারত্ব, খাবার কেনার টাকাও ছিল না
প্রবাসজীবনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না ফয়সালের। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, ভাষার সীমাবদ্ধতা আর কাজের অনিশ্চয়তার মধ্যে একসময় টানা আট মাস কাতারে বেকার থাকতে হয় তাঁকে।
হাতে টাকা ছিল না, খাবার কেনার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছিলেন। এমনকি সকালের নাশতার খরচ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। চারপাশে পরিচিত মানুষ থাকলেও নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করার মতো কাউকে সব সময় পাওয়া যেত না। নীরবে সহ্য করতে হয়েছে মানুষের অবহেলাও।
দেশ থেকে মা ও বোনেরা ফোন করে জানতে চাইতেন, চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে কি না। তাঁদের দুশ্চিন্তা কমাতে ফয়সাল বলতেন, ‘ব্যবস্থা হয়ে যাবে, তোমরা চিন্তা করো না।’
কিন্তু ফোনের ওপাশে আপনজনদের আশ্বস্ত করলেও ফোন রাখার পর নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভেঙে পড়তেন তিনি। পরিবারের মানুষগুলোকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতে গিয়ে নিজের কষ্টগুলো একাই বহন করতেন।
দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো একজন মানুষ
জীবনের কঠিন সময়ে একজন মানুষের সামান্য সহযোগিতাও কখনো কখনো আশীর্বাদ হয়ে আসে। ফয়সালের জীবনেও তেমন একজন মানুষ আছেন—নিজ এলাকার বড় ভাই কাউছার আলম ভূঁইয়া।
আট মাসের কর্মহীনতায় যখন প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন ফয়সাল, তখন কাউছার আলম ভূঁইয়া তাঁকে হোটেলে কাজ করার প্রস্তাব দেন। তাঁর বলা একটি কথা আজও মনে গেঁথে আছে ফয়সালের।
তিনি বলেছিলেন, ‘হোটেলে কাজ করতে পারবে, কোনো সমস্যা নেই। আমি খেলে তুমিও খাবে, আমি কাজ করলে তুমিও করবে।’
কথাগুলো হয়তো খুব সাধারণ, কিন্তু অসহায় একজন মানুষের কাছে সেদিন তা ছিল নতুন করে বাঁচার সাহস। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর ফয়সালের মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে এখনো এমন মানুষ আছেন, যাঁরা অন্যের কষ্ট অনুভব করেন এবং দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে জানেন।
এরপর শুরু হয় নতুন করে পথচলা। কাজের সুযোগ ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে জীবনে আসে কিছুটা স্বস্তি, ফিরে আসে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস।
এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, অর্থের প্রয়োজন আছে ঠিকই, কিন্তু বিপদের সময় একজন মানুষের পাশে আরেকজন মানুষের দাঁড়ানোর মূল্য অনেক সময় অর্থের চেয়েও বেশি।
প্রবাসের মাটিতে সাংবাদিক হয়ে ওঠা
প্রবাসজীবনে ফয়সালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সাংবাদিকতা। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তাঁর কাছে বিশেষ আনন্দের।
কাতারে থাকার একপর্যায়ে সাবেক শিক্ষক আমিনুল হক কাজল স্যারের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। কাজল স্যারের কাছ থেকেই সাংবাদিকতার প্রাথমিক শিক্ষা পান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত লেখক সাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে।
এরপর বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা ও টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন ফয়সাল। কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক কর্মকাণ্ড, সাফল্য, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে থাকেন।
একসময় ঢাকা টাইমস, ঢাকা মেইল, বাংলা ট্রিবিউন ও দৈনিক লাখো কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাতার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করে সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই ও প্রতিবেদন তৈরির বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
বর্তমানে কাতার থেকে দেশ টিভির ট্রেইনি রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছেন তিনি। দীর্ঘদিনের চেষ্টা ও শেখার আগ্রহকে নিজের এই পথচলার অন্যতম প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন ফয়সাল। তবে এখনো নিজেকে প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক নয়, বরং প্রতিনিয়ত শিখতে থাকা একজন শিক্ষার্থী হিসেবেই ভাবেন।
সাফল্য মানেই শুধু অর্থ-বিত্ত নয়
দীর্ঘ ১২ বছরের প্রবাসজীবনে ফয়সাল বুঝেছেন, সাফল্যের পেছনে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা ব্যক্তিগত পরিশ্রমই নয়, সুযোগ, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং মানুষের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর চোখে, প্রবাসে কেউ অল্প সময়েই প্রতিষ্ঠিত হন, আবার কেউ বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন না। একজন ভালো নিয়োগকর্তা, সময়মতো বেতন এবং মানবিক কর্মপরিবেশ একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, বড় হতে হলে ছোট থেকেই শুরু করতে হয়। প্রতিকূলতার কারণে থেমে না গিয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের আসল লড়াই।
প্রাপ্তি ও কৃতজ্ঞতা
নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে ফয়সাল মনে করেন, হয়তো এখনো বড় কোনো সাফল্যের গল্প তৈরি করতে পারেননি। তবু নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করছেন, নতুন কিছু শিখছেন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
তাঁর কাছে সাফল্য শুধু অর্থ-বিত্ত কিংবা পরিচিতি দিয়ে মাপার বিষয় নয়। সম্মানের সঙ্গে কাজ করে যাওয়া, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো এবং মানুষের ভালোবাসা অর্জন করাও জীবনের বড় প্রাপ্তি।
তিনি কৃতজ্ঞ সৃষ্টিকর্তার প্রতি এবং তাঁদের প্রতি, যাঁরা তাঁকে শিখিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন ও কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিশেষ করে কাউছার আলম ভূঁইয়ার সহযোগিতা তাঁর জীবনে মানবিকতার এক উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে রয়েছে।
সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে ছুটতে হারিয়ে যায় কত গল্প
প্রবাসে অনেক মানুষ নীরবে পরিশ্রম করেন। কেউ পরিবারের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেন, কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কঠিন জীবন বেছে নেন। তাঁদের অনেকের জীবনের গল্প অজানাই থেকে যায়।
আবুল কালাম ফয়সালের গল্পও তেমনই এক জীবনের গল্প—যেখানে আছে আট মাসের কর্মহীনতা, খাবারের কষ্ট, পরিবারের কাছে নিজের অসহায়ত্ব লুকিয়ে রাখা, একজন মানুষের সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়ানো এবং সাংবাদিকতার মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা।
প্রবাসের মাটিতে জীবন কাটলেও হৃদয়ের একটা বড় অংশ পড়ে থাকে নিজের দেশ ও প্রিয়জনদের কাছে। সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবনের অনেক গল্প হারিয়ে যায়, তবু স্বপ্ন দেখা থামে না। কারণ প্রবাসীরা শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য বাঁচেন না—তাঁরা বাঁচেন পরিবার, ভালোবাসা আর সুন্দর আগামী দিনের আশায়।
এমএমএস