নোয়াখালী সদর উপজেলার ৭ নম্বর ধর্মপুর ইউনিয়নের সন্তান ছালা উদ্দিন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে, ২০০৭ সালের ২৮ আগস্ট নিজের ও পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমান সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তাঁর স্বপ্ন ছিল খুব সাধারণ—পাঁচ বছর প্রবাসে থেকে ১০ লাখ টাকা উপার্জন করবেন। পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে বাবার ঋণ শোধ করবেন, আর বাকি পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে দেশে গড়ে তুলবেন নিজের ব্যবসা। কিন্তু জীবনের হিসাব যে এত সহজ নয়, তা বুঝতে তাঁর বেশি সময় লাগেনি।
কষ্টের দিনগুলো
প্রবাস জীবনের শুরুটা ছিল ভীষণ কঠিন। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুতি নিয়ে খাবারের বাটি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো গাড়ির অপেক্ষায়। সকাল পাঁচটায় গাড়িতে উঠলেও কর্মস্থলে পৌঁছাতে বাজত ছয়টা। সকাল ও দুপুরে এক বাটি করে ভাত—কম বেতনে তিন বেলা ভাত খেয়েই কাটত দিন।
কোম্পানি ১০ ঘণ্টার বেতন দিলেও যাতায়াতসহ কাজের পেছনে চলে যেত ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা। মাসে বেতন পেতেন মাত্র ৭০০ দিরহাম, বাংলাদেশি টাকায় তখন প্রায় ১৪ হাজার টাকা। নিজের খরচ বলতে শুধু থাকার জায়গায় খাবারের বিলটুকু রেখে বাকি সব টাকা পাঠিয়ে দিতেন দেশে। কারণ, তাঁকে বিদেশে পাঠাতে বাবা ঋণ করে খরচ করেছিলেন ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
নিজের কষ্টের চেয়েও বাবার ঋণের বোঝা তাঁকে বেশি ভাবাত। তাই সীমিত আয়ের মধ্যেও পরিবারের জন্য টাকা পাঠানো বন্ধ করেননি কখনো।
কিন্তু প্রবাসে থাকা মানুষটি যে কতটা কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন, তা দেশে বসে অনেকেই বুঝতেন না। সবার ধারণা ছিল, বিদেশে গিয়ে তিনি বেশ ভালো আছেন। অনেক আত্মীয়-স্বজনও তাঁর কাছে বিদেশে যাওয়ার ভিসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ করতেন।
নিজের মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থেকেই একসময় এলাকার এক ব্যক্তির মাধ্যমে কয়েকজনকে বিদেশে আনার উদ্যোগ নেন তিনি। পাসপোর্টের কপি ও টাকা তুলে দেন সেই ব্যক্তির হাতে। কিন্তু সেই বিশ্বাসই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম বড় ভুল ও কষ্টের অভিজ্ঞতা। আপনজনদের সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, অথচ সেই সিদ্ধান্ত তাঁকে দুঃখের স্মৃতি উপহার দেয়।
সংসার, সন্তান আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
২০১৩ সালে প্রথমবার দেশে ফেরেন ছালা উদ্দিন। দেশে গিয়েই বিয়ে করেন। স্ত্রীর সঙ্গে কাটানো পাঁচটি মাস ছিল তাঁর জীবনের অন্য রকম সুখের সময়। নিজের হাতে তখন তেমন টাকা ছিল না, তবু পরিবারকে কাছে পেয়ে মনে হতো, আর যদি বিদেশে ফিরতে না হতো! কিন্তু দেশে স্থায়ীভাবে কিছু করার মতো পুঁজি না থাকায় আবারও ফিরে আসতে হয় প্রবাসে।
ফিরে এসে বেতনের পরিবর্তন না দেখে একসময় চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কোম্পানি কারণ জানতে চাইলে নিজের অসুবিধার কথা খুলে বলেন। এরপর তাঁকে আবুধাবি শহরে একটি ইরানি ব্যাংকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। নতুন কর্মস্থলে মনোযোগ দিয়ে কাজ শুরু করেন। বেতন বাড়ে, পাশাপাশি পার্টটাইম কাজের সুযোগও পান। দিনের কাজ শেষে আরও তিন-চার ঘণ্টা পরিশ্রম করতেন বাড়তি আয়ের আশায়।
২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে বাবা হন ছালা উদ্দিন। পৃথিবীতে আসে তাঁর প্রথম সন্তান, একটি কন্যা। মেয়ের জন্মকে তিনি আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে দেখেন। এরপর তাঁর জীবনের প্রতিটি পরিশ্রমের পেছনে যুক্ত হয় নতুন এক স্বপ্ন—সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
দুই ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা, ছোট বোনের দায়িত্ব, সংসারের খরচ—সবকিছু সামলে নিয়মিত টাকা পাঠাতেন দেশে। একসময় তাঁদের বাড়িতে তৈরি হয় একটি পাকা ভবন। ২০১৭ সালে দেশে ফেরার আগে নিজের জন্য একটি নতুন মোটরসাইকেলও কিনেছিলেন। দেশে পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্যদের ভালোবাসা আর যত্নে মুগ্ধ হন তিনি। তাঁর জন্য 11মোটরসাইকেলটি ঘরে তুলে রাখা হয়েছিল, যেন তিনি ফেরার আগে পরিবারের অন্য কেউ সেটি ব্যবহার না করেন।
প্রবাসে কাটানো দীর্ঘ কষ্টের দিনগুলোর মাঝে পরিবারের এই ভালোবাসাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
নিজের জন্য কিছু করার স্বপ্ন
২০২১ সাল থেকে ছালা উদ্দিন নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নতুনভাবে চেষ্টা শুরু করেন। পরিবারের নিয়মিত খরচের বাইরে দেশে অতিরিক্ত টাকা পাঠানো কমিয়ে নিজের জন্য সঞ্চয় করতে থাকেন। এরই মধ্যে জমি কিনেছেন, বাড়িতে নিজের জন্য একটি ঘর তৈরির কাজও শুরু করেছেন।
জীবনে অনেক কিছু অর্জন করলেও তাঁর মনের ভেতর আজও একটি অপূর্ণতা রয়ে গেছে। তিনি দেশে ফিরতে চান, স্ত্রী-সন্তানদের পাশে থেকে জীবনের বাকি সময়টুকু কাটাতে চান। সন্তানদের বড় হতে দেখতে চান নিজের চোখের সামনে। কিন্তু তিন সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের খরচ এবং দেশে স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা না থাকায় সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারছেন না।
আজও তাঁকে হিসাব করতে হয়—দেশে ফিরে কী করবেন, কীভাবে চলবে সংসার, কীভাবে পূরণ করবেন সন্তানদের ভবিষ্যতের চাহিদা?
প্রবাসীর জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ
ছালা উদ্দিনের গল্প শুধু একজন মানুষের বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জনের গল্প নয়। এটি একজন সন্তানের বাবার ঋণ শোধের চেষ্টা, একজন স্বামীর সংসার গড়ার সংগ্রাম, একজন বাবার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লড়াই।
যে মানুষটি মাত্র পাঁচ বছর থাকার পরিকল্পনা নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন, তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় কেটে গেছে প্রবাসেই। পরিবারকে ভালো রাখার জন্য দূরে থাকতে থাকতে আজ সেই পরিবারটির সঙ্গেই স্থায়ীভাবে থাকার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
প্রবাসীরাও দেশে ফিরতে চান। তাঁরাও চান প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রতিটি সকাল শুরু করতে, সন্তানদের বেড়ে ওঠা দেখতে, বাবা-মায়ের পাশে থাকতে। কিন্তু দেশে ফিরে সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা না থাকায় অনেকেরই ফেরা হয়ে ওঠে না।
ছালা উদ্দিনের মতো হাজারো প্রবাসীর বুকের ভেতর জমে আছে একই প্রশ্ন—জীবনের এতটা সময় পরিবারের জন্য উৎসর্গ করার পর, কবে তাঁরা পরিবারের সঙ্গে নিশ্চিন্তে বাঁচার সুযোগ পাবেন?
এমএমএস