বাংলাদেশের গণমাধ্যম, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিত নাম মুস্তফা মনওয়ার সুজন। গ্লোবাল টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সুজন পেশায় সাংবাদিক। গল্পকার হিসেবেও আলোচিত। তার বিজ্ঞানভিত্তিক একাধিক উপন্যাস পাঠকের চিন্তায় এনেছে নতুন মাত্রা। সাংবাদিকতার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রগতিশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণের আন্দোলন-সংগ্রামে তার সরব ও সক্রিয় সংযোগ উল্লেখযোগ্য।
মুস্তফা মনওয়ার সুজন সম্প্রতি প্রবাসী ক্লাবে পরিচালক পদে যোগ দিয়েছেন। তিনি এই ক্লাবে পরিকল্পনা পরিচালক হিসেবে কাজ করবেন।
পৈত্রিক নিবাস নোয়াখালী সদরের চরমটুয়া ইউনিয়নের শ্রীকৃষ্ণপুর গ্রামে মুস্তফা মনওয়ার সুজনের জন্ম । শৈশব ও কৈশর কেটেছে জেলা শহর মাইজদীতে। তার বাবা অধ্যাপক মোহাম্মদ হাশেম ছিলেন বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের বরেণ্য গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী। মা রওশন আরা। সুজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার দেলোয়ার হোসেনের নাতি।
মুস্তফা মনওয়ার সুজন নোয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী হরিনারায়নপুর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সাল প্রথম বিভাগে এসএসসি এবং নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে ১৯৯৪ সালে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর ১৯৯৯ সালে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে বিএসসি (অনার্স) এবং ২০০২ সালে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯৮ সালে দৈনিক সংবাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক হিসেবে মুস্তফা মনওয়ার সুজনের সাংবাদিকতা শুরু। এরপর তিনি দৈনিক যুগান্তরের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হন এবং ২০০৪ সালে ওই পত্রিকায় সহ-সম্পাদক পদে যোগ দেন।
পর্যায়ক্রমে তিনি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক ভোরের ডাক, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ, দৈনিক বাংলাদেশ জার্নাল এবং সংবাদ সংস্থা বিডিলাইভ, বাংলাটাইমস ও নিউজ বাংলায় বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এসএ টিভির বার্তা বিভাগে যোগ দিয়ে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় আসেন এবং সেখানে দুই বছর কাজ করেন। বর্তমানে তিনি গ্লোবাল টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক। পেশাগত অভিজ্ঞতায় সুজনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ২০০৮ সালের দিকে তিনি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসিতে মিডিয়া কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন।
সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সুজন বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে এর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন -বিএফইউজে এর সদস্য এবং মোহাম্মদ হাশেম ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক। সুজন সাস্ট স্ট্যাটিসটিক্স অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং নোয়াখালী সাংবাদিক ফোরাম, ঢাকা-এনজেএফ এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
শিক্ষাজীবন থেকেই মুস্তফা মনওয়ার সুজন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় ছিলেন। তিনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক (১৯৯৯-২০০২), শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সভাপতি (২০০১-২০০২) এবং চোখ ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি (২০০০-২০০৩) ছিলেন।
মুস্তফা মনওয়ার সুজন চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি বিষয়ক লেখালেখিতেও সক্রিয়। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে চলচ্চিত্র বিষয়ক ছোটকাগজ ‘প্রক্ষেপণ’ এবং কবিতার কাগজ ‘আড্ডা’। তিনি দুটি পত্রিকারই প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
মুস্তফা মনওয়ার সুজনের প্রকাশিত গ্রন্থ-
‘একাত্তরের ডিসেম্বর’ (২০১৮): মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের মাসকে কেন্দ্র করে লেখা গবেষণাধর্মী বই। এটি প্রকাশ করে উৎস প্রকাশন।
‘বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মতবাদ’ (২০১৯): বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে রচিত গবেষণাগ্রন্ত, যা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত। বইটির দ্বিতীয় সংস্করন প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে। এটি প্রকাশ করে উৎস প্রকাশন।
‘অতিপ্রাকৃত অথবা কাকতালীয়’ (২০২২): বিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাস। এটি প্রকাশ করে বিশ্বসাহিত্য ভবন।
‘খলিশাপুরের কুকুরগুলো এবং রকিবের থিসিস’ (২০২৩): বিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাস। এটি প্রকাশ করে বেহুলা বাংলা।
সাহিত্য ও গবেষণা ক্যাটাগরিতে ২০২২ সালে ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিল-ডিএসইসি লেখক সম্মাননা লাভ করেন মুস্তফা মনওয়ার সুজন।
ছাত্রজীব থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রগতিশীল দেশ বিনির্মাণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। সাংবাদিকতা ও লেখায় তিনি এই চেতনার প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। মুক্তচিন্তর এই লেখক মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বরাবরই আপোসহীন। তার লেখা ও গবেষণার বিষয় মূলত: মুক্তিযুদ্ধ, মনোজগৎ ও বিজ্ঞান। মানুষের আচরণবিধির অস্বাভাবিক বিপর্যয়ের সম্ভাব্য কার্য-কারণ উঠে এসেছে তার বিবিধ লেখায়। তার সাংবাদিকতা, উপন্যাস, গল্প আর বিপ্লবি মানসের প্রধান লক্ষ্য- প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণ।
মুস্তফা মনওয়ার সুজনের স্ত্রী সানজিদা সুলতানা পেশায় সাংবাদিক। তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের সহ-সম্পাদক। অমিয়া হাশেম এই দম্পতির একমাত্র কন্যা। সুজন একাধারে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠক। সাংবাদিকতার ব্যস্ততার মাঝেও তিনি গবেষণা, লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। কর্মনিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও সৃজনশীলতা তাকে দেশের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
(এসবি)